ওপেনসোর্স আন্দোলন (open source movement/initiative) সারা বিশ্বের সফটওয়্যার জগতের একটি বহু আলোচিত/বিতর্কিত বিষয়। ওপেনসোর্স বলতে সফটওয়্যারের সোর্সকোডকে সহজে পর্যবেক্ষন, পরিমার্জন ও ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া বুঝানো হয়ে থাকে। ওপেনসোর্স আন্দোলনের মূল ফ্রি (উন্মুক্ত/স্বাধীনতা অর্থে) সফটওয়্যার আন্দোলনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান ১৯৮৫ সালে ফ্রি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেন এবং সেই সাথে ফ্রি সফটওয়্যার আন্দোলনের সূচনা করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ ফ্রি (উন্মুক্ত) সফটওয়্যারের সাথে ফ্রি (বিনামূল্যের) সফটওয়্যার গুলিয়ে ফেলতে থাকে বলে ১৯৯৮ সালে জন হল, লেরী আগাসটিন, এরিক রেমন্ড, ব্রুস পেরেন্স প্রমুখ ওপেনসোর্স আন্দোলনের কথা ঘোষণা দেন। বিএলইউএ (বাংলাদেশ লিনাক্স ইউজার্স এলায়েন্স্) একটি অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন যার মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা ও বিভিন্ন সাহায্য সহযোগীতা প্রদান। তবে কেবল লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমের প্রসারের মধ্যেই বিএলইউএ-এর কার্য পরিধি সীমাবদ্ধ নয়। লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন ওপেনসোর্স সফটওয়্যারগুলোর ব্যবহারবিধি এবং বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগীতা প্রদান করাও এর উদ্দেশ্য। ১ যুগ আগে কম্পিউটারের ব্যবহার যখন শুরু করেছিলাম তখন সফটওয়্যার লাইসেন্স, পাইরেসী, ওপেনসোর্স এসব জিনিস তেমন ভালো বুঝতাম না। যা যখন পেয়েছি ব্যবহার করেছি, আমরা দোকান থেকে যে সফটওয়্যারের সিডি নিয়ে এসে ব্যবহার করছি তাও যে বেআইনী (পাইরেটেড) সেসম্পর্কে কোন ধারনাই ছিলো না। যতোদূর মনে পরছে ২০০৫ সালের দিকে ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করি, এরপর আর পায় কে? এই সাইট সেই সাইট ঘুরাঘুরি করার পাশাপাশি সফটওয়্যার ডাউনলোড করে চালাতাম। তখন যেগুলো ফ্রি পেতাম খুব ভালো লাগতো আর যেগুলো কিনতে হতো সেগুলোর ডেভেলপার কোম্পানিগুলোর উপর রাগ উঠতো। একসময় টরেন্ট র্যাপিডশেয়ারের মতো সাইটের খোঁজ পাই যেখান থেকে বিভিন্ন কমার্সিয়াল সফটওয়্যার কোন টাকা না দিয়ে ডাউনলোড করতে শুরু করি, বিষয়টি অন্যায় বুঝতে পারলেও তেমন গা করিনি, আমার দরকার আমি নামিয়ে ব্যবহার করছি। কিন্তু কিছুদিন পরে পাইরেটেড সফটওয়্যারের প্রতি বিতৃষ্ণা বাড়তে থাকে। একসময় সকল পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করে ফ্রিওয়্যার ব্যবহার করতামওপেনসোর্স আন্দোলনের ইতিহাস
এই ওপেনসোর্স আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হলো যেকোন সফটওয়্যার ব্যবহার, পরিবর্তন এবং (ক্ষেত্রবিশেষে) বিতরণের পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করা। একটি সফটওয়্যারের সোর্স কোড যদি উন্মুক্ত হয় তাহলে
১) সফটওয়্যারের ক্রুটি (bug) দ্রুত দূর করা সম্ভব হবে
২) সফটওয়্যারের সাপোর্ট উন্নত মানের হবে (যেহেতু পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে যেকোন ডেভেলপারের সাহায্য পাওয়া যাবে)
৩) ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী সফটওয়্যার কাস্টোমাইজেশন সহজ হয়ে ওঠা
৪) একটি সফটওয়্যারের কোড দেখে আরও উন্নত অপর একটি সফটওয়্যার তৈরি করা সহজ
৫) ওপেনসোর্স সফটওয়্যারের বিভিন্ন ডিরাইভেটিভস থাকার কারনে ব্যবহারকারীরা যেকোন পরিস্থিতিতে তাদের চাহিদা মেটাতে পারেন
৬) অধিকাংশ ওপেনসোর্স সফটওয়্যার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত
বাংলাদেশ লিনাক্স ইউজার্স এলায়েন্স্
বিএলইউএ-র স্বেচ্ছাসেবকরা বিভিন্ন বাংলাদেশী ফোরাম সাইট ব্লগের মাধ্যমে অনলাইন জগতে বাংলাদেশীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন আর্টিকেল, টিউটোরিয়াল, রিভিউ প্রভৃতি দিয়ে আসছেন। কেবল ভার্চুয়াল জগতই নয় বাস্তব জগতেও বিএলইউএ-র সদস্যরা তাদের সাধ্যমতো মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আলোচনা করছেন। প্রায়ই বিভিন্ন সভা-সেমিনার আয়োজন করেছেন ওপেনসোর্স/লিনাক্স বিষয়ে সাধারন মানুষকে ধারনা দেবার জন্য। এছাড়াও যেকোন ব্যবহারকারী স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে যোগাযোগ করে ওপেনসোর্স/লিনাক্স বিষয়ে ব্যক্তিগত সাহায্য নিতে পারেন।
বর্তমানে বিএলইউএ-র নিচে যেসকল প্রজেক্ট রয়েছে
উবুন্টু বাংলাদেশ
ফেডোরা বাংলাদেশ
ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্স পোর্ট (বাংলাদেশ)
রয়েল বেঙ্গল লিনাক্স (কোডনেম:rbl একটি পরীক্ষামূলক লিনাক্স ডিস্ট্রিবিউশন)
ওপেনসোর্স এবং আমি
২০০৫-৬ সালের দিকে পিসিওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন পড়া শুরু করি, সেখান থেকেই জানতে পারি ওপেনসোর্স বিভিন্ন সফটওয়্যারের কথা। কয়েকটি নামিয়ে ব্যবহার শুরু করি। পছন্দ হওয়ায় আরও আগ্রহী হয়ে উঠি, নিয়মিত বিভিন্ন ওপেনসোর্স এ্যাপ্লিকেশনের খোঁজ রাখতাম। তখনই লিনাক্স সম্পর্কে বিভিন্ন আর্টিকেল পড়েছি। আগে শুনতাম এ্যাডভান্সড একটি অপারেটিং সিস্টেম টেকনিক্যাল মানুষরা ব্যবহার করেন সার্ভার আর অন্যান্য প্রফেশনাল কাজে। কিন্তু পরে বিভিন্ন সাইটে দেখি সাধারণ ব্যবহারকারীদের মাঝেও লিনাক্সের বেশ গুনগান। বিশেষ করে উবুন্টু এর বেশ কয়েকটি রিভিউ দেখেছিলাম। এরপর উবুন্টু ৭.১০ (গাটসি গিবন) রিলিজ হবার পর পজিটিভ একটা রিভিউ-এ এরকম একটা রিভিউ দেখলাম “In the end we can say that Ubuntu 7.10 Gutsy Gibbon have made Linux operating system easily usable for the general non-geek user”। ওটাই আমার জন্য টার্নিং পয়েন্ট ছিলো, অনেক চিন্তা করে ঠিক করলাম উবুন্টু নামিয়ে ব্যবহার করে দেখবো। ২সপ্তাহ ধরে ডাউনলোড করার পর পেনড্রাইভে করে নিয়ে গিয়ে সিডি রাইট করায় আনলাম। এরপর ভয়ে ভয়ে ঢুকায় ইনস্টল মারলাম। পার্টিশন অংশে বুঝতে কষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত কোন সমস্যা ছাড়াই ইনস্টল হয়ে গেলো। আমার মজা দেখে কে? লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছি ![]()
উবুন্টু লিনাক্স ব্যবহারের পর থেকে মনে হতে থাকে আরো কিছু দরকার। আমাদের দেশে ওপেনসোর্স/লিনাক্স নিয়ে কি কিছুই করার নেই? ইন্টারনেটে ঘুরতে ঘুরতে উবুন্টু বাংলাদেশ সাইট দেখলাম। প্রচেষ্টাটি ভালো লাগলো, সাহায্য করার কোন উপায় আছে নাকি তা জানার জন্য যোগাযোগ করলাম। এরপরে বিভিন্ন আর্টিকেল, টিউটোরিয়াল সংগ্রহ, খবর সংগ্রহের মতো ছোটখাটো কাজ করে এসেছি। দেখতে দেখতে ১ বছর পাড় হয়ে গেলো এবং কি একটা বছর যে গেলো? দৌড়াদৌড়ি, পাইরেসীর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা, দুইটি সভার আয়োজন আরো কতো কি। বাংলাদেশে ওপেনসোর্স ও লিনাক্সের প্রচলনে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারছি এটা ভাবতেই ভালো লাগে। আশা করি সামনের দিনগুলো আরও আনন্দদায়ক হবে…………
(আপনি যদি ওপেনসোর্স আন্দোলনে আগ্রহী হোন অথবা বিএলইউএ সম্পর্কে মতামত/পরামর্শ অথবা জিজ্ঞাসা থাকে তাহলে মন্তব্যের ঘরে আপনার মন্তব্য অথবা যোগাযোগ ঠিকানা প্রদান করুন। )
Recent Comments