আমার চাকরী জীবন

অফিস আমার ধানমন্ডি-৮ এ, ধানমন্ডি মাঠের পাশে। প্রতিদিন সকালে বারিধারা ডিওএইচএস-এর বাসা থেকে অফিস যেতে ঝামেলা পোহাতে হয়। রিক্সা নিয়ে শেওড়া যাই এরপর অপেক্ষা বাসের জন্য। শেওড়া থেকে আমি অফিসে আসার জন্য তিনটা বাস আছে লোকাল ২৭ নম্বর বাস,অনিক আর সূচনা। ২৭ নম্বর বাস শেওড়ায় থামেনা চালুর উপর রাখে, আর তাতে আগে থেকেই বাঁদুড় ঝোলা হয়ে মানুষ থাকে ওতে ওঠা আর যুদ্ধের ময়দানে সম্মুখ যুদ্ধে জেতা একই কথা, আমার মতো তালপাতার সেপাই-এর পক্ষে সম্ভব নয়। অনিক বাস তেঁজগাও-সাতরাস্তা মোড়-এফডিসি-কাওরান বাজার-পান্থপথ হয়ে কলাবাগান যায়। ওই বাসে ওঠা মানে হচ্ছে দিনের কোন সময় অফিস পৌছাবো তা সৃষ্টিকর্তার হাতে ছেড়ে দেয়া। আর সূচনা, এর সার্ভিস কিছুদিন আগেও মোটামোটি ছিলো, কিন্তু এখন ওরা বাস স্টাফবাস হিসেবে ভাড়া দিয়ে বাস সংকট সৃষ্টি করেছে, অনেকক্ষণ পরপর তাদের বাস আসে, এবং সেই বাসেও যথারীতি বাঁদড়ঝোলা হয়ে থাকে মানুষ। তবে কাকলী গিয়ে সূচনা অনেকটাই খালি হয়ে যায়। তাই অফিস যাওয়ার জন্য আমি রিক্সা নিয়ে কাকলী যাই আগে, সেখান থেকে সূচনা বাসে উঠি। দরকারে লোকাল ২৭ নম্বর বাসে উঠি, কিন্তু তাতে জামা কাপড়ের ইস্ত্রি আর কিছু বাকি থাকে না, আর প্যান্টে বেশ বড় বড় ছাপ পরে ধুলামাখা পায়ের পাড়া খেয়ে। ইদানিং যেটা হয়েছে সিএনজিতে অনেক চড়া শুরু করেছি সবসময় বাসে চড়তে ভালো লাগে না তাই সিএনজি ধরে চলে যাই, তবে সমস্যাও আছে সিএনজিতে গেলে বা আসলেই দেড়শ টাকা বের হয়ে যায় পকেট থেকে (এই অভ্যাস কমাতে হবে মাসে ৪-৫ হাজার টাকা দিয়ে যাতায়াত করা পোষাবে না)।

এইটুকু পড়ে মনে হতে পারে যে আমি কেবল চাকরি করার কতো কষ্ট তারই বয়ান করতে চাচ্ছি। আসলে তা নয়। চাকরির মধ্যে কষ্ট দুইটা এক সকালে ঘুম থেকে ঠিক সময়ে ওঠা এবং দুই অফিসে যাতায়াতের ঝক্কি। কিন্তু অফিসে পৌছে গেলে পর পুরোপুরি নতুন পরিবেশ। কাজ করতে বেশ মজাই আছে।

আমার পোস্টের গালভরা নাম থাকলেও কাজ যে আসলে কি সেটাই বোঝানো কঠিন। আমাদের ডিপার্টমেন্টের কাজ হচ্ছে যারা লোন নিয়ে ডিফল্টার হয়েছে (ইনস্টলমেন্ট দিতে পারেনি) অথবা ক্রেডিটকার্ডের বিল পে করছে না তাদের কাছ থেকে ব্যাংকের টাকা পুনরুদ্ধার করা। আমার কাজ হচ্ছে কালেক্টরদের বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করা, কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে, কিভাবে কি অফার দিলে ক্লায়েন্ট আগ্রহী হবে এমন কয়েকটা বিষয়ে পলিসি তৈরি করা। কিন্তু সেটা অনেক পরের কাজ, এখন বর্তমানে ব্যাংক কিভাবে কাজ করছে তা শিখছি। কাজ শিখতে খারাপ লাগছে না, একেকজন একেকভাবে এ্যাপ্রোচ করে একেকজন একেকভাবে কাজ শিখায়।
আমার কাজ আসলে প্রতিদিন এ্যাসাইন হয়। হঠাৎ দেখা যেতে পারে ইনচার্জ কোন রিপোর্টের এক্সট্র্যাক্ট চাইছে, সেটা পাঠাতে হবে। অথবা আমার ইনচার্জ কোন কাজ করছেন তো পাশে বসে দেখা, পরামর্শ দেয়া বা তার কাজ এগিয়ে রাখা। মাস শেষে কিছু রুটিন কাজ আমাকে করতে হয়, যেমন সেটলমেন্ট এগ্রিমেন্ট পেপার স্ট্যাটাস (ক্লোস্ড/রেগুলার/ডিফল্ট) মেলানো, ক্লোজার নোটের সাথে মিলিয়ে দেখা, রাইটঅফ পেপার তৈরি ইত্যাদি। কিন্তু এসব রুটিন কাজ দেখা যায় মাসের প্রথম ১০-১৫ দিন ব্যস্ত রাখে এরপর হাত একটু খালি হয়।

আমার কাজের বেশিরভাগই করতে হচ্ছে স্প্রেডশীটে, অনেক নতুন জিনিস প্রথমদিন থেকেই শিখছি। তবে ম্যাক্রোটা একটু দেখতে হবে এখন কথা হলো ম্যাক্রো কে শিখাবে?? :(

আরেকটা দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাকে মাইক্রোসফটের পণ্য ব্যবহার করতে হচ্ছে অফিসে :( । এগুলোর সবগুলোই লাইসেন্সকৃত, কিন্তু তারপরও ব্যবহার করতে বিরক্ত লাগে। ইশশ কবে যে আমাদের স্বপ্ন সত্যি হবে, সব বড় বড় প্রতিষ্ঠান ওপেনসোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার করবে। আমাদের বস এসব বিষয়ে বেশ ওয়াকিবহাল এবং আগ্রহী, কিন্তু ব্যাংকের পলিসির বাইরে তো কিছু করা সম্ভব না।

আরেকটা বিষয় হলো অফিসে গেলে বাইরের জগতের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। উহু ইন্টারনেট কানেকশন আছে ফোনও আছে। কিন্তু অফিসের কাজে লাগে না এমন কোন ওয়েবসাইট এক্সেস করা যাবে না (করা যায় তারপরও অফিসের মধ্যে ব্যবহার করতে ভালো লাগে না), টুইটার বন্ধ, ফেসবুক স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ (এটা আমার দরকারও নেই, কিন্তু টুইটার নাই!!!)। পেপার পড়া যায় না, অনলাইন নিউজ চ্যানেল কয়েকটা এক্সেস করা গেলেও যখন পড়ি তখন আশেপাশের মানুষ এমন বাঁকা চোখে তাকায় যে স্বস্তি লাগে না।
ফোন আমি এমনিতেই কম ব্যবহার করি, আর অফিসে ফোনে কথা বলার সুযোগ কম। কারণ আমি আরেকজনের সাথে কিউবিকল শেয়ার করি, আর আমাদের ম্যানেজার/ইনচার্জ বসেন আমাদের আগের কিউবিকলে। ফোনে কথা বলতে হলে উঠে বাইরে সিড়িতে ‍যেতে হয়, সিড়িতেও কেউ না কেউ থাকে।

এই বাইরের জগতের অভাব খুব বেশি যে অনুভব করি তা নয়,যখন কাজ থাকে তখন কাজ করতে এতো মজা লাগে যে সময় কোথা দিয়ে কেটে যায় বুঝাই যায় না। কিন্তু আবার হুটহাট যখন অবাক করা খবর শুনি তখন এই অভাববোধটা বেড়ে যায়। যেমন ধরুন উইকিলিকস আর তার প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে নিয়ে যে নাটক চলছে তা তো আমি সে আটক হবার পরে জানতে পারলাম তার আগে নয়। এখনও সর্বশেষ আপডেট জানি না। নিশ্চয়ই টুইটার ফেসবুক ও অনলাইন টেক জগতে বেশ ঝড় উঠছে এটা নিয়ে, মিস করছি খুব। মাস্টারকার্ড ভিসার উপরে যে আক্রমণ হয়েছে তাও মিস করেছি :( বর্তমানে সনির উপর এ্যাটাক চলছে তাও ফলো করতে পারছি না। এই অভাব বোধটা বেড়ে যায় যখন দেখি অফিসে কোন কাজ নেই। আমি খুব মিশুকে মানুষ নই যে কাজ না থাকলে সবার সাথে মিশবো গল্প করবো। তাই করুণ মুখ করে বসে থাকতে হয়। অপ্রয়োজনে উপর নিচ করি চারতলা আর পাঁচতলায় যদি কেউ কোন কাজ দেয়। হয়তো কেউ ডেকে বললো এই এটা করতে সাহায্য করো তো, অথবা বসের সাইন নিয়ে আসো তো একটু। সেসবও খারাপ লাগে না, অন্তত বসে থাকার চেয়ে তো অনেক ভালো।

অফিসের সহকর্মীরাও অনেক ভালো আছে। অন্তত যারা সিনিয়র অফিসার তারা অনেক ভালো।

আমাদের ডিপার্টমেন্ট ইনচার্জ/ম্যানেজার অসাধারণ মানুষ, ইয়াং এ্যানার্জেটিক, কাজ ছাড়া কিছুই বুঝেন না। খুব বেশিদিন হয়নি নর্থসাউথ থেকে পাশ করেছেন, এক দেড় বছরের মাথায়ই নিজের মেধা আর শ্রম দিয়ে ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজার হয়ে গেছেন। অনেককিছু দেখান অনেক বিষয়ে পরামর্শ দেন। কিন্তু যখন নিজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তখন তাকে কোনকিছু বলতেও ভয় লাগে।

আর আছেন রিকোভারি-ক্রেডিট কার্ড টিমের বস। ইনি মজার মানুষ। খুব হইহুল্লোর করে কাজ করেন আর প্রতিটা কাজে সবাইকে ইনভল্ভ করা পছন্দ করেন। উনি হাতে ধরে সব কাজ শিখান, কোন ছোট বিষয়ই বাদ দেয়া পছন্দ করেন না। তবে তার কাজের পদ্ধতির বাইরে নতুন কিছু তিনি সহজে গ্রহণ করতে পারেন না এটা কখনও কখনও আমার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

আরেকজন আমোদপ্রিয় মানুষ হচ্ছেন রিকভারি-পারসোন্যাল লোন টিমের বস। ইনি সবসময় হাসছেন রাগ করতে দেখিনি এখনও। নিজে প্রতিদিন নতুন কিছু পরীক্ষা করতে পছন্দ করেন। ওনার হয়ে কাজ করে আরাম আছে কারণ হলো কাজ কিভাবে করবো এটার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব আমার, ফলাফলটা সঠিক হলেই চলবে। আরও একটা বিষয় হচ্ছে আমাদের রিকভারি টিমের বিভিন্ন ম্যাগাজিন আর বুলেটিনের দায়িত্বে আছেন উনি (রিকভারী বুলেটিনে ইতিমধ্যে আমার “চাকরীটা পেয়ে গেছি পারী শুনছো” আর “শক্তির উৎস, কিছু প্রাককথন” লেখা দুইটি দিয়েছি)।

রিকভারী এন্ড লিগাল টিমের এ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার দেখতে অনেক গম্ভীর। অনেক সিনিয়রও উনি। এই কারণে তার আশেপাশে ঘেষতে অস্বস্তি লাগে। কিন্তু সবাই বলে উনি নাকি টিমের মধ্যে সবচেয়ে আমোদপ্রিয় মানুষ খাওয়াদাওয়া ফুর্তিতে ব্যস্ত।

আমাদের টিমে আর আছেন কালেক্টরগন (গালভারী নাম হচ্ছে কাস্টোমার সার্ভিস এ্যাডভাইজর CSA, এ্যাসিস্ট্যান্ট কাস্টোমার এ্যাসিসটেন্স অফিসার ACAO ও কাস্টোমার এসিস্টেন্স অফিসার CAO)। এনারা নিজেদের কাজ ভালো বুঝেন, প্রতিমাসেই বিভিন্ন ধরনের রেকর্ড সেট হচ্ছে আমি জয়েন করার পর থেকেই তা দেখছি। এদের মধ্যে যেমন হৃদ্যতা আছে তেমনই আছে প্রতিযোগীতা। ওনাদের পারফর্মেন্স এ্যাপ্রেইসাল প্রতি মাসে হলেও প্রতি কোয়ার্টারে গড় পারফর্মেন্স রেটিং বের করা হয়। বেশিরভাগ ব্যক্তিই “এক্সিলেন্ট” রেটিং পেয়ে আছে। এই একটা জিনিস আমার মন খারাপ করায়, সেটা হচ্ছে আমার বুঝার উপায় নেই আমার পারফর্মেন্স কেমন, আমার কোন রেটিং নাই আমার পারফর্মেন্স ইভেলুয়েশনও কিভাবে হবে জানি না। যদি তাই হয় তাহলে কি আদৌ আমার ভবিষ্যত এখানে শানিত হবে?

একটা জিনিস ভালো লাগে সেটা হচ্ছে মাস শেষে যখন কিছু টাকা পড়ে আমার ব্যাংকের একাউন্টে। আর সবচেয়ে মজা পাচ্ছি কার্ড ব্যবহার করে (এখনই বাজে অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে দোকানে গিয়ে কেনা কাটা বা খাওয়া দাওয়া করে কার্ড এক্সেপ্ট করে নাকি খোঁজ নেয়ার)। নাহ আমি ক্রেডিট কার্ডের কথা বলছি না, আমার ডেবিট কার্ডই ভালো অযথা দায় তৈরির প্রয়োজন নেই, নিজের যা আছে তা নিয়েই মৌজমস্তি করা ভালো।

যাই হোক এগুলো তো ছোটখাটো দিক। আমার দিন কাটে বাসা-অফিস-বাসা এই আবর্তে, ছুটির দিনগুলোতেও বেশিরভাগ সময় এখন বাসার টুকটাক কাজ করতে হচ্ছে (বাসার একমাত্র ছেলে হওয়ার কিছু অসুবিধাও আছে :( )। তার মাঝে নিজের জন্য ভালোবাসার মানুষের জন্য বন্ধুবান্ধবের জন্য কিছু সময় বের করে নেয়ার আকুলতা। মাঝে মধ্যে যখন একা একা ভাবি তখন মনে হয় আমি আমার জন্য যে জীবন ভেবেছিলাম এখন তার থেকে কতোটা ভিন্ন জীবনই না কাটাচ্ছি। এটা কি ভালো নাকি খারাপ এখনও তা বলতে পারি না আরও কয়েক বছর কাটলে আরও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর বলতে পারি কোথায় দাঁড়াতে পারতাম আর কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। আপাতত দিন আসে দিন যায় ভিত্তিতেই জীবন চলতে থাকুক।

আমার এই লেখাটি সম্পর্কে আপনার যে কোন মতামত অবশ্যই নিচে জানাবেন। আর ভবিষ্যতে আমার নতুন লেখা পড়ার জন্য আমার ব্লগেরRSS ফিডে সাবস্ক্রাইব করতে পারেন।
  1. Seems like you are having fun at work! :) All the best!

    • আশাবাদী

      ধন্যবাদ,
      হুমম নতুন চাকরী, ভিন্ন স্বাদ ভালোই লাগে। তবে একই চক্রে কাজ করতে সবদিন ভালো লাগে না, মাঝে মাঝে ফাঁকি দিতে মন চায় কিন্তু উপায় থাকে না। তখন খারাপ লাগে।

  2. চাকরিতে মাঝে মাঝে ফাঁকি দিতে হয়… নাহলে শরীর স্বাস্থ্য ভাল থাকেনা।

    ব্যাংকের চাকরিতে যে অনেক ঝক্কি – বড়মামা একটা ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হবার সুবাদে ব্যাপারটা জানা ছিল। মামাকে সবসময়ই রাত করে বাড়ি ফিরতে দেখতাম। বেচারা রিটায়ার্মেন্টে গিয়ে এখন মহা আনন্দে আছে! :)

    • আশাবাদী

      তথাস্তু বলে আজ চাকরীতে ফাঁকি দিচ্ছি, আজ অফিস যাইনি :P

  3. চাকুরী করার এই একটা অসুবিধা, সময় শুধুই চলে যায়। নিজের দিকে তাকানোর সময় পাওয়া যায় না :(

    • আশাবাদী

      হু ভাই, মাঝে মাঝে একদমই ভালো লাগে না কিছু। সব ছেড়ে দূরে জঙ্গলে গিয়ে বাস করতে ইচ্ছে করে :(

      • জঙ্গলে যদি যেতে হয়! সাথে নিও আমাকে
        অজুহাত চলবে না একদম ই সেখানে :-P

Leave a Comment


NOTE - You can use these HTML tags and attributes:
<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>