ভালোবাসা-কিছু আবোলতাবোল চিন্তা

ভালো মন্দ বলতে পারি না তবে বর্তমানে ভালোবাসার সংজ্ঞা কিছুটা বদলেছে, ভালোবাসার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশেও এসেছে ভিন্নতা। একসময় ছিলো যখন ভালোবাসাটা পর্দার আড়ালেই ছিলো। কখনও কখনও একজন ছেলে একজন মেয়েকে ভালোবাসছে তা বুঝাই যেতো না। অথচ আজ রাস্তা ঘাটে যুগলবন্দী তরুণতরুণী দেখা অস্বাভাবিক নয়। তাদের কাউকে হাত ধরে হাটতে দেখা যায়, কেউ বা নিরালায় কাধে মাথা রেখে বসে গল্প করছে, কেউ হয়তো গালে/চুলে হাত বুলিয়ে আদর করছে। ভালোবাসা কোন অন্যায় নয় যে তা প্রকাশ করা যাবে না, সংগোপনে রাখতে হবে।

অথচ আমাদের সমাজে আজকাল ঘনিষ্ঠভাবে কোন ছেলেমেয়েকে দেখলেই “গেলো গেলো” রব ওঠে, দোষ দেয়া হয় অপসংস্কৃতির। আসলে দোষ আমাদের নিজেদের মানসিকতায়। আমরা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাস করেও যেনো মধ্য যুগে বাস করি। আমরা বড়ই জটিল এক সমাজে বসবাস করি। ছেলে মেয়ের বিভেদ এখানে বড্ড বেশি। একজন ছেলে আর একজন মেয়ে বড় হয় দুরকম পরিবেশে, ভিন্ন বেড়াজালের আড়ালে। ছেলে মেয়েদের শেখানো হয় তুমি ছেলে তুমি মেয়ে, ছেলে হিসেবে তুমি এই এই করতে পারো আর তুমি মেয়ে হিসেবে এটা এটা করতে পারো না, তোমাদের অবাধে মেলামেশা বৈধ নয়, মিশলে সর্বনাশ হয়। ছেলে মেয়েদের মাঝে তাই বিস্তর মানসিক দূরত্বও তৈরি হয়ে যায়। এরই মাঝে যুক্ত হয় না না অর্ধ সত্য আর বিকৃত তথ্য। ছেলে মেয়েদের মাঝে সুন্দর নিটল পবিত্র কোন সম্পর্ক হতে পারে এই ধারণা খুব কম মানুষের হয়। আমিও বড় হবার সময় কোন ছেলের সাথে কোন মেয়েকে কথা বলতে দেখলে পর্যন্ত দেখতাম আড়ালে এটা নিয়ে ঠাট্টা তামাশা টিপ্পনি দেয়া হচ্ছে। সব সম্পর্কেই ভালোবাসায় গড়ায় না আর সব ভালোবাসার সম্পর্কই শারীরিক সম্পর্কে নিহিত হয় না। আমার জানা মতেই আমি বেশ কিছু সম্পর্ক দেখেছি যা গভীর আস্থার নির্ভরতার সর্বোপরী নিটোল বন্ধুত্বের। অথচ তাদের নিয়েও কটু মন্তব্য কম ছড়ায়নি। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের মাঝে ভালোবাসা নিয়ে যে বিরুপ মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে তা স্থায়ী হবে। এতে মানুষ ভালোবাসার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, বুঝবে না ভালোবাসার মহিমা।

যদি কোন জুটির মধ্যে গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক থাকে তা কোন অন্যায় নয়। ভালোবাসা নিটোল পবিত্র, মানুষের জীবন পরিপূর্ণ করে, জীবনে অর্থ এনে দেয়। হ্যাঁ ভালোবাসলে জৈবিক বা প্রাকৃতিক যে কারণেই হোক না কেনো ছেলে মেয়েরা একে অপরকে নিবিড়ভাবে চেতেই পারে কাছে যেতেই পারে। চাই সমাজ সংসার স্বীকৃতি দিক বা না দিক ভালোবাসা কখনও ভুল হতে পারে না, ভালোবেসে কাছে যাওয়াও ভুল নয় অন্যায় নয়। আর সেই সাথে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ অশালীন হবে কেনো? আমাদের সমাজে বিভিন্ন রকম মানষিকতার মানুষ বাস করে তাদের সবার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে এবং তারা তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি সংরক্ষণ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন আছে তেমনই ভালোবাসার মানুষদেরও আছে তাদের মনের অভিব্যাক্তি প্রকাশের। আমরা সবাই সমাজে থেকেও নিজ নিজ জীবন নিয়ে নিজের জগতে আলাদা থাকে। সেই জগতে তার ভালোবাসা তার প্রিয়জনের প্রতি নিবেদন করা যেতেই পারে। তাই আমাদের আরও সহনশীল হওয়া উচিত এই বিষয়ে। এই কথার সাথে সাথে চলে আসে এই বিষয় যে অনেকেই ভেবে নেন অতিরিক্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ মানে ভালোবাসার পাত্রপাত্রীর সম্পর্ক অনেকদূর গড়িয়ে শারীরিক সম্পর্কে মিলেছে।

ভালোবাসা মানবিক আকর্ষণের মাঝে দানা বাধে এরপর তা গভীর হতে হতে ইন্দ্রিয় আকর্ষণে রূপ নেয়। শরীর বহির্ভুত আত্মীক প্রেম ভালোবাসা সম্ভব, কিন্তু শরীরের মধ্যেই মন-আত্মার বাস, শরীর বাদ দিয়ে কি ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে? এখানে যদি নৈতিকতার দোহাই দিয়ে বলা হয় বিবাহ বহির্ভুত কোন শারীরিক সম্পর্ক প্রশ্নবিদ্ধ তবে বিবেচনা করতে হবে বিবাহ যে সুদৃঢ় সম্পর্ক গঠনে ভূমিকা রাখে তা ইতিমধ্যেই এই ভালোবাসার যুগলের মাঝে বিদ্যমান কিনা। একটি সফল সম্পর্কের জন্য যে স্তম্ভ রয়েছে (আস্থা, বিশ্বাস, নির্ভরতা, একে অন্যকে বুঝতে পারার ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ ইত্যাদি) সেসব সবই যদি তাদের ভালোবাসার মাঝে থাকে তবে সেই ভালোবাসা পরিপূর্ণ। সত্যিকারের ভালোবাসা যে বন্ধন তৈরি করে দেয় তা আর যেকোন বন্ধনের চেয়ে হাজারগুন মজবুত, তার জন্য বিবাহ নামক সামাজিক স্বীকৃতি/ছাড়পত্রের প্রয়োজন আদৌ থাকে কি?

ভালোবাসার পাত্রপাত্রী কি করবে সেটা তারাই সিদ্ধান্ত নিবে, তারা যথেষ্ঠ বিচক্ষণ বলেই ভালোবাসার মতো গুরুগম্ভীর এক সম্পর্কের সূচনা করতে পেরেছে। এবং আমরা তাদের সিদ্ধান্তে পূর্ণ শ্রদ্ধা দেখিয়ে নিজেদের মতো থাকতে পারি, তাদের সম্পর্কে কটু মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।

আগেই বলেছি ভালোবাসা পবিত্র সম্পর্ক, ক্ষনিকের মোহ আকর্ষণ কখনই সত্যিকার ভালোবাসার সমার্থক নয়। ভালোবাসা কেবল নিছক আবেগ নয় এটা একটা সম্পর্কের নাম, যে সম্পর্কে আস্থা বিশ্বাস দায়িত্বের সাথে অঙ্গীকার আছে একসাথে থাকার, যা মঙ্গলময় তা করার, অমঙ্গল থেকে দূরে থাকার। মানুষ ভুল করতেই পারে, ভালোবাসার সম্পর্কেও পাত্রপাত্রী ভুল করতে পারে কিন্তু তাদের ভুলের দায়িত্ব নেয়ার মানসিকতা, সাহস ও সদিচ্ছা থাকতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আর যাই সিদ্ধান্ত নেয়া হোক না কেনো তার সাথে শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে। তাহলেই উপরে বলা সব কথা সত্য হবে নাহলে সবই মেকি সবই রঙীন খেলা ছাড়া কিছুই থাকবে না শেষ পর্যন্ত।

====
এই লেখায় ভালোবাসা বলতে আমি সত্যিকারের ভালোবাসার সম্পর্ক বুঝিয়েছি, তথাকথিত প্রেম প্রেম খেলা নয়। এখানে প্রকাশিত সকল দৃষ্টিভঙ্গি একান্তই আমার নিজস্ব। এর সাথে আমার পরিবার অথবা আমার ভালোবাসার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কোন সম্পর্ক নেই। প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ ও মতামত প্রকাশের অধিকার সংরক্ষণ করে। আমিও করি এবং তার একটি ছোট প্রয়োগ এই লেখাটাতে।
====

আমার এই লেখাটি সম্পর্কে আপনার যে কোন মতামত অবশ্যই নিচে জানাবেন। আর ভবিষ্যতে আমার নতুন লেখা পড়ার জন্য আমার ব্লগেরRSS ফিডে সাবস্ক্রাইব করতে পারেন।
  1. অনেক দিন পর তোমার লিখা পড়লাম কারন তো জানোই আমাদের “সুন্দরী পিঠা” এর পরীক্ষা ছিল তাই ইন্টারনেট সংযোগ ই ছিল না বাসায়। অনেক ভালো লিখেছো সত্যিই অনেক ভালো লেগেছে পড়ে। আসলে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই কেমন জানি আগোছালো আর খানিকটা অস্থির ও।
    মানুষ জনের এমন আচরণের জন্যই মাঝে মাঝে ভালোবাসার মহিমা ম্লান হয়ে যায়। সেই সাথে ম্লান হয়ে যায় সব।

Leave a Comment


NOTE - You can use these HTML tags and attributes:
<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>