মানুষের নানা রকম ইচ্ছে থাকে, স্বপ্ন থাকে। ছোটবেলায় মানুষের একরকম ইচ্ছে থাকে, বড় হতে হতে সেই ইচ্ছে বিভিন্ন দিকে মোড় নেয়, তা কখনও ছোট খেলনা থেকে শুরু করে স্বপ্নের গ্যাজেট বা স্বপ্নের পেশা নানা দিকে ঘুরপাক খায়।
ছোটবেলায় কোন খেলনার জন্য বায়না বা আবদার খুব বেশি করেছি এমন মনে পড়ে না। অনেকেই এখন মনে করে যে আমরা অনেক বৈভব/প্রাচুর্য্যের মধ্যে বড় হয়েছি কিন্তু সত্যি হলো যে আমরা কোনকিছুর আবদার করে সহজে পেতাম না।
মনে পড়ে ছোটবেলায় আমার শখ ছিলো একটা ব্যাটারিচালিত ট্র্যাক সহ ট্রেনসেটের, জন্মদিনে উপহার হিসেবে চেয়েও ছিলাম। ট্রেনসেটের বদলে আমাকে মনোপলি কিনে দিয়েছিলো প্রথমে খুব মন খারাপ হলেও মনোপলি খেলে অনেক মজা পেয়েছি। (এখনও মনোপলি খেলা খুব মিস করি, ইশশ কারো যদি একটু সময় হতো খেলার)।
আমাকে একটা প্লেন কিনে দিয়েছিলো যেটার সামনের প্রপেলার ঘুড়িয়ে ছেড়ে দিলে উড়তো, কিন্তু ‘গুড ফর নাথিং’ এই আমি প্লেনটা কোনভাবেই উড়াতে পারতাম না আমার বোনরাই চালাতো। এরপর আমার এক কাজিন এসে সেটা উড়াতে গিয়ে গাছে লাগিয়ে হত্যা করে আমার সখের খেলনাকে।
আমার মেঝবোনের একটা সাইকেল ছিলো সেটা আপু সাই সাই করে চালায় যেতো আর আমি হা করে দেখতাম নাহলে পিছন পিছন দৌড়াতাম। আমার চেয়ে সাইকেল বড় হওয়ায় আপুর সাইকেল তখনও চালানো হয়নি। একদিন সেই সাইকেল নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আপু ভুড়ু কাটলো আর সাইকেল গুরুতর আহত হয়ে গুদামঘরে ঠাঁই পেলো। আমাদের কোয়ার্টারের বারান্দাতে আরেকটা সাইকেল রাখা ছিলো আব্বুর। সেই সাইকেলে আমরা উঠে রিক্সা চালানোর মতো প্যাডেল মারতাম। আমাদের প্যাডেল মারতে দেখলেই আব্বু বলতো “ভালো করে শিখে রাখো পড়াশুনা না করলে তো এই রিক্সা চালাতেই হবে তোদেরকে”। যাই হোক এমন করেই বছরের পর বছর কেঁটে যায়। এরপর আমার বারো বছরের জন্মদিনে ঘুম থেকে টেনে উঠানো হলো, রাজ্যের ঘুম নিয়ে ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখি ছোটাপুর সাইকেলটা গুদামঘর থেকে বের করে পরিস্কার করা হয়েছে এবং ঠিকও করানো হয়েছে। আমার খুশি দেখে কে। কিন্তু যথারীতি ‘গুড ফর নাথিং’ এই ছেলেটা সাইকেল চালাতে পারে না, কোনভাবেই সে তার ব্যালেন্স ঠিক করতে পারে না। বাইরে নিয়ে গিয়ে বোনরা কতো তাকে ঠেলে দিয়ে ছেড়ে দেয়, ছেড়ে দেয়ার দুই তিন সেকেন্ডের মধ্যেই ধপাশ। আমাকে তো কোয়ার্টারের ছেলেরা খ্যাঁপায় সাইকেল চালাতে পারিনা দেখে, আমার বোনরা কতো বুঝালো ওদের সাইকেল নাই তাই হিংসে করে তোমাকে খ্যাঁপাচ্ছে, কিন্তু বোঁকা আমি কোনভাবেই মানলাম না, আর বেরই হোলাম না সাইকেল চালানো শেখার জন্য। বাসার ভিতরই দুই পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে কিছুদূর যেতাম আর পা দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে ব্যালেন্স করতাম যাতে পরে না যাই। এভাবেই একদিন বাইরে নিয়ে চালাতে গিয়ে দেখি প্যাডেল মেরে সাইকেল চালাতে পারছি, কি মজা!! এরপর সেই সাইকেল অনেকদিন চালানো হয় পরে আরও একটি সাইকেল ছিলো। দুটোই অন্যকে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, একদিন দুইদিন সাইকেল চালাতে ইচ্ছে করলেও খুব ক্লান্তিকর মনে হয় এখন সাইকেল চালানো যেটা অনেক আনন্দের আর এ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ দিতো।
তবে এমন বড় আবদারের জিনিস খুব কমই পেয়েছি। ছোটবেলায় আমাদের বাবার কাছ থেকে প্রায়ই শুনতে হয়েছে টাকা নাই, খেলনা দিয়ে খেলতে হবে না মাঠে গিয়ে দুইটা চক্কর দিয়ে আসুক, নাহলে কাপড় লাগবে না খালি গায়ে ন্যাংটা হয়ে ঘুরুক অথবা পেন্সিল কলম চাইলে শুনতে হয়েছে আঙ্গুল কেঁটে লিখুক কিনে দিতে পারবো না। এর মানে এটা না যে আমাদের বাবা মা ভালোবাসতেন না, খুব বেশিই ভালোবাসতেন। আমাদের বাস্তবতা সম্মন্ধে ধারণা দিতেই হয়তো আমাদের সব আবদার সাথে সাথে মিটাতেন না, রয়ে সয়ে সময় নিয়ে দিতেন।
ছোটবেলায় এমন কথা শুনে খুব রাগ হতো মনে হতো এমন বাবা মা’র সাথে থাকবো না, যখন বড় হবো যখন আমার অনেক টাকা হবে তখন আমি ইচ্ছে মতো জিনিস কিনবো আর অন্যদেরও কিনে দিবো। সেই সময় থেকে একটা শখ হয়েছিলো আমি অনেক বড় হবো হয়তো অনেক বড় ব্যবসায়ী হবো আমার অনেক টাকা থাকবে যে আমাকে কোন কাজই করতে হবে না, নিজে থেকেই টাকা আসবে আর আমি সেই টাকায় আরামে আছি। আমার একটা সুন্দর বাসা আছে, না পাঁকা বাড়ির আলিসান বাড়ি না; অনেকখানি জায়গা নিয়ে ছোট একতলা বা দোতলা বাড়ি। কখনও কল্পনা করেছি ছনের দেয়াল ছনের ছাঁদ, মাটির মেঝেতে গদি পেতে থাকা আর ঘরভর্তি গল্পের বই। বাইরে সবুজে ঘেরা বাগান, একপাশে একটা জলাশয় তার পাশে ছাউনি ঘেরা বসার জায়গা আরও কতো কি। সেসব জায়গার ছবি একে রাখতাম আর ঘন্টার পর ঘন্টা সুখস্বপ্নে মজে থাকতাম।
আবার অনেক সময় মনে হতো যে অনেক বড় ব্যবসায়ী হতে হলে অনেক বুদ্ধি আর টাকা থাকা লাগে, কোনটাই আমার নাই তাহলে ছোট একটা চাকরী নিবো যেটা দিয়ে আমার নিজের চলে যাবে। মনে আছে পড়াশুনা বাদ দিয়ে খাতায় শুধু হিসেব করতাম এক মাসে আমার কতো খরচ হতে পারে, একরুমের হোস্টেল রুমের চাঁদা কতো, চাল ডালের দাম কতো, গল্পের বইয়ের দাম কতো, কাপড় চোপড়ের দাম কতো এইসব করে নানা রকম হিসাব করতাম। কখনও ৫হাজার টাকা হিসাব হতো কখনও ১৫ হাজার টাকা। আর আমি শুধু ভাবতাম কবে বড় হবো।
তারপর আরেকটু বড় হলাম, কলেজে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় কৈশোরের এই ইচ্ছে বা সখের স্থান নিলো আরও বড় কিছু। চারপাশের অনিয়ম খুব কষ্ট দিতে শুরু করে মনে হয় মানুষ এমন করে কেনো? আমরা একটু চেষ্টা করে কি ভালো কিছু আনতে পারি না? তখন স্বপ্ন দেখা শুরু করি বড় কোন আন্দোলনে জড়িত আছি, ধীরে ধীরে হলেও মানুষ তাদের ব্যবহার বদলাচ্ছে, নিয়ম মানছে শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। অনলাইনে যুক্ত হবার পর দেখলাম সশরীরে উপস্থিত না থেকেও কোন কাজে অবদান রাখা যায়। তখন কিছু একটা পরিবর্তনের আকাঙ্খা পেয়ে বসলো। ওপেনসোর্স লিনাক্স জগত আমার সামনে নতুন দোয়ার নিয়ে আসে। ওপেনসোর্স কমিউনিটিতে কিছুদিন কাজ করি কিছুটা হলেও আমাদের চারপাশ বদলানোর অঙ্গিকার নিয়ে। কিন্তু হায় এখানেও যে একই দলাদলি একই চরিত্রের প্রতিফলন। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম।
এদিকে বিবিএ পড়াশুনো শেষ করে ফেললাম, সবাই শুধু জিজ্ঞাসা করে কিছু করছি নাকি, ক্যারিয়ার নিয়ে কোন চিন্তাভাবনা আছে নাকি। গড়িমসি করে এক বছর কাটানো হয়ে গেলো, এরপর অনেক চোখ রাঙানী, জীবন সঙ্গীনীর চোখের জলের ফল হিসেবে একটা ছোট চাকরী জোগাড়। চাকরী হতে না হতেই নিজের ছোটবেলার অনেক অপূর্ণ আকাঙ্খা পূরণের ইচ্ছে জাগলো। এখন প্রতি মাসে বেতন পাওয়া আর কিছু টাকা জমানোর চেষ্টা। নতুন চাকরী নতুন স্বপ্ন বুনা, সাথে যোগ হয় আরও নিত্য নতুন আকাঙ্খা। যোগ হয়েছে বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্যের শখ। একটা ল্যাপটপ কিনার শখ বহুদিনের, আর একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা বেসিক থেকে ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে শখের ফটোগ্রাফি করার জন্য। জীবন সঙ্গীনীকে পছন্দের আংটি দেয়া। ইচ্ছে একটা নিজের পছন্দ মতো ছোট গাড়ি কেনার। স্বপ্ননীড়কে সত্যি হিসেবে দেখতে চাই। নিজের সাজানো সংসার দেখতে চাই। আরও কতো কি। এসব সবকিছুর জন্য টাকা জমানোর চেষ্টা।
কিন্তু ছোটবেলায় করা পাটিগণিতের ফুটো জলাধারের সেই অঙ্কের মতো অবস্থা, একটা খাতে টাকা জমানোর চেষ্টা আর অন্য খাতগুলোতে কখন যে কিভাবে টাকা বেরিয়ে যায় আটকানোর যো নেই। গত তিন মাসের হিসাব নিকাস শেষে দেখা যাচ্ছে আমার আয়ের চেয়ে ব্যায় বেশি। এক মাসের বেতন শেষ হয়ে যাবার কিছুদিনের মধ্যে আরেক মাসের বেতন পেয়ে যাই বলে এই বিষয়টা বুঝতে পারিনি, হিসাব রাখতে শুরু করার পর এটা লক্ষ্য করলাম। কিন্তু যেসব খাতে খরচ হয় সেগুলো কমানোর উপায় দেখি না। যখন হিসাব দেখি, মনে হয় তখন হায় হায় কমাতে হবে মনে হয় কিন্তু কমানো হয় না। আমি যেমন লাগামহীন জীবন চেয়েছিলাম তাতে তো কোন হিসাবের বিষয় ছিলো না তাতে ছিলো না খরচ কমাবার তাগিদা। এখনও কিছুটা লাগামহীন রয়েছি, হয়তো সারাজীবনই থাকবো। হয়তো চাকরী বদলাবো হয়তো বেতন বাড়ানোর জন্য বলবো। আমার লাটাইছেঁড়া ইচ্ছেঘুড়ি আপন খেয়ালে উড়তে থাকবে এলোমেলোভাবে ঠিক যেমন এলোমেলো আমার এই লেখাটা। যখন শুরু করেছিলাম তখন ইচ্ছে ছিলো আমার ছোট ছোট শখ আহ্লাদের কথা বলবো, ইচ্ছের কথা বলবো। কিন্তু তা না হয়ে আবোলতাবোল কিছু বাক্যের সমাহার। কিন্তু তারপরও তা আমার মনের কথা, আপন কথা।
১।
ছোটবেলার শখগুলো পূরণ করতে বসলে আমাকে কোটি-কোটি-পতি হতে হবে। একটা ছয়চাকার ট্রাক (যেটা করে প্রতিদিন অফিস থেকে বাসায় আসব), একটা পার্সনাল ট্রেন (যেটাতে চড়ে যখন-তখন যেকোন স্টেশনে নেমে চিপস খাওয়া যাবে), একটা আইসক্রিম ফ্যাক্টরি (নিজের ফ্যাক্টরির আইস্ক্রিম নিজে খাব, আম্মু বকাঝকা দিতে পারবেনা), একটা উড়োজাহাজ (যেটাতে সামনে দিয়ে মেশিনগান লাগানো থাকবে), একটা লাল ফায়ারব্রিগেটের গাড়ি (অ-নে-ক লম্বা মই থঅকতে হবে), একটা কিট (নাইট রাইডারের গাড়িটা), একটা এয়ারউল্ফ … এভাবে লিখতে লিখতেই ফতুর হয়ে যাব!
২।
দেশ নিয়ে স্বপ্ন এখনো দেখি। যদিও জানিনা স্বপ্নকে কীভাবে বাস্তব করা যায়, তারপরও স্বপ্ন দেখি।
৩।
প্রতিবারই মনে হয় এই মাসটা খরচ করি, সামনের মাসে লাগাম টেনে ধরব – সেই সামনের মাসটা সবসময় সামনেই থেকে যায়, কখনো বর্তমানে আসেনা। :S
আয়-ব্যয় নিয়ে আমিও ব্যালান্স করতে পারিনা। আপনি তো তা-ও চেষ্টা করেন টাকা জমাবার, আমি সেই চেষ্টাটাই শুরু করতে পারিনা!
“ইচ্ছে হলো এক ধরনের গঙ্গাফড়িং, অনিচ্ছেতেও লাফায় খালি তিড়িং বিড়িং
কই মোটেও আবোলতাবোল বাক্যের সমাহার না বেশ ভালো লিখেছো। আমার তো মনে হলো তোমার ব্লগ না আমি তোমার চিঠিই পড়ছি 
ইচ্ছে হলো এক ধরনের বিড়ালছানা, মিহি গলার আবদারে সে খুব সেয়ানা”
http://www.youtube.com/watch?v=ziJCeNIwgrY
অনেকদিন পর তোমার লিখা পড়লাম
আসলে কিছু কিছু ইচ্ছে এমন যা পরে স্বপ্নে পরিণত হয়, তোমার ইচ্ছে গুলো স্বপ্ন গুলো পুর্ণ হোক সেই কামনাই করি।
আহারে মেঝেভর্তি কিংবা ঘরভহর্তি বইয়ের স্বপ্ন আমারো আছে কিন্তু হয় না কই কই যে সব ইচ্ছেরা চলে যায় টের ও পাই না শুধু টের পাই দিন চলে যাচ্ছে